মরুতীর্থ হিংলাজ
পথের ক্লান্তি ভূলে ( মুভি Review)
শিমলগুড়িতে দুজন 'ছড়িদাড়' ছড়ি নামিয়েছেন, ছড়ির ভোগ দিতে হবে, যাত্রাবিরতিতে ছড়ির ভোগ দিতে হয়। ছড়ি হচ্ছে একটি ভয়ানক পবিত্র বস্তু বা লাঠি, যাকে এক ছিলিম ধোয়া উৎসর্গ করতে হয়। দুজন ছড়িদারের বয়স একত্র করলেও কেন জানি বয়স ত্রিশ পার হয়না। বড়জন যখন তখন হিন্দিগান গেয়ে উঠেন, যেনো সবকিছু যেভাবে ঘটার কথা সেভাবেই ঘটবে, একচুলও ব্যাতিক্রম হবে না কোন কিছুর। আর ছোটজন ভ্রমমনে ছুটে চলে কৌতুহলের দিকে, সে তার কৌতুহল নিবারনের জন্য যে কোন কন্ডিশনে যেতে রাজি।
পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত হিংলাজ এলাকা। হিঙ্গুলা দেবীর মন্দির সংলগ্ন গ্রামের নামানুসারেই এই এলাকার নামকরন করা হয়েছে। সেখানে বাস করে অনেক মুসলমান, হিংলাদেবীর মন্দিরটি তাদেরও খুব আদুরে ছিলো, তারা তাকে ডাকত, ‘নানী কি হজ্ব’ নানী কি পিঠ’ বা হিঙ্গলপিঠ নামে। ১৯৫৯ সালে প্রচারিত মরুতীর্থ হিংলাজ সিনেমাটি বাংলা ভাষায় নির্মিত একটি অনবদ্য সিনেমা যেখানে কুন্তি ও তিরুমুল নামে দুজনের প্রেম চিত্রায়িত করা হয়েছে।সিনেমাটি ইউটিউবে এ্যাভলএবল আছে, চাইলেই দেখতে পারেন, ওল্ড স্ক্রীনপ্লে আর দুর্বল সাউন্ড কোয়ালিটির কারণে মনোযোগ আসতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু সিনেমাটি যা ইভুলেট করার চেষ্ঠা করেছে, তা প্রকাশে সিনেমাটি পরিপূর্ণ সফল। হিংলাজ মিথের সাথে জড়িত সকল প্রশ্নের উত্তর এই সিনেমায় খুঁজে পাওয়া যায় তবে উপন্যাসটির পাতায় পাওয়া যায় সুনিপুণ লেখার কৌশল।
হিংলাজ দেবীর উদেশ্যে বের হওয়া একদল তীর্থযাত্রীর পদসঞ্চালনের মত ধীরে ধীরে পরিনতির দিকে এগুতে থাকে তাদের প্রেম কাহিনী। সিনেমার শেষাংশে যা দেখানো হয় তাতে সিনেমাটিকে শুধু সিনেমা বললে ভুল হবে। কখনো কখনো সিনেমা যে তার সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে বাস্তবতার খুব কাছাকাছি এসে আমাদের হৃদয়ে নাড়া দেয় তা এই সিনেমায় বোঝা যায়। কুন্তি ও তিরুমুলের প্রেম কাহিনী ছাড়াও সিনেমাটিতে অনেকগুলো ফিলোসফিকাল স্টেজ বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন, তিরুমুলের কান্ধে ধর্মগুরুর মৃত্যু, তার পাগলের মতো কথাবার্তা, ভ্রম-ব্যাধিতে জীবন উৎসর্গ করা, শেষাংশে কুন্তিকে কাধে নিয়ে সাধুর দৌড়ঝাঁপ, সকলি আসলে সিনেমাটির মধ্যে লুকায়িত ফিলোসফিকাল এ্যাক্টিভিটির অংশ যা সিনেমাটির পরিচালক বিকাশ রায় ও উপন্যাসের পান্ডুলিপির রাইটার দুলাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায় (অবদূত) খুব সুক্ষভাবে সিকুয়েন্টিং করেছেন। ইন্টারনেটে ফ্রি ক্লাসিক বুক নামে একটা ব্লগস্পট থেকে বইটি ফ্রি ডাউনলোড করতে পারেন। ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত ঐ উপন্যাসটি পড়লেই মুলত বোঝা যায় ‘অবদূত ইজ এ রাইটার অফ হিজ ওন ওয়ার্ডস্। বইটা পড়লেই জানা যায় তার স্ক্রিপটিংয়েই মুলত প্রতিটা দৃশ্য, দৃশ্যের ধারাবাহিকতা, সিম্পিল কিছু ফ্রেমে, সুনিপুন ভাবে সাজানো আছে। অবদূতের লেখা আরেকটি উপন্যাস উদ্ধারণপুরের ঘাট যা সে সময়ের ব্যাপক জননন্দিত লেখা। সে সময়ের রাইটাররা অবদূতকে বেআব্রু লেখক বলতো। সবাই সমালোচনা করত তার লেখার। তার লেখার একটা অংশ থেকে-
‘মুয়ে আগুন মাগির,
আজ সকালে শাঁখা শিঁদুর খোয়ালি,
আর রাতটা পোহাতে তর সইলো না তোর,
এর মধ্যে নুড়ো জ্বেলে দিলি নিজের মুখে!
” উক্তিটি আসলে ধিক্কারোক্তি, ধিক্কারটি যে অবদূত কাকে দিলেন, আমি জানি না।
মরুতীর্থ হিংলাজ উপন্যাসের একটা অংশে, মরুভুমির উত্তপ্ত বালুর বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখক অবদুত যুক্তির অবতরন করেছেন- ‘সূর্যের চেয়ে বালুর তাপ বেশি’ অনেক লেখকই এধরনের যুক্তির অবতরন করে, যেমন-‘বাঁশের চেয়ে কঞ্চি শক্ত’ অতঃপর পুরো ব্যাপারটাকে দাড় করতে বিশাল গল্প কাহিনী রচনা করেন, শেষমেষ একটা কিছু হয়ে যায়, কিন্তু অবদূত খুব অল্প কিছু কথা, অল্প কিছু শব্দ দিয়ে কেমনে জানি প্রমান করে ফেলল, সুর্যের চেয়ে বালুর তাপ বেশি’ সেই বালুর তাপ পায়ের পাতায় প্রবেশ করে মস্তিষ্কে প্রবেশ করে, খালি করে দেয় পুরো মাথাটা, সেই খালি মাথা যখন শুন্য হয়ে যায় কুন্তিরা চিৎকার করে উঠে তিরুমুল তিরুমুল বলে।
প্রচুর কিউরিওসিটি হচ্ছে অবদূতকে নিয়ে! ব্যাক্তিগত লাইফে অবদূত একজন সাধক, আঠারো বছর ঘুরে বেরিয়েছেন ভারতবর্ষের যত সত্য পিঠগুলোতে। হিংলাজ মাতার দেহ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে সেদিন কারা যেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছিল, অবদূত সেই খন্ডাংশ খুঁজে ফিরছিল একটা লং টাইম। আচ্ছা, অবদূত কি সেই খণ্ডাংশগুলো খুঁজে পেয়েছিল? অবদূতের ব্যাক্তিগত জীবন থেকে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। অবদূতকে জানা যায় তার লেখায়।
সিনেমার একটা জায়গায় হাড় জীর্ণ একজন কই থেইকা জানি মরুতীর্থ যাত্রিদের দলে এসে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়, ‘আমার ভাগের রুটি কই, আমার ভাগের ত্রিশটা রুটি কই, আমি রুটি খাবো, কতদিন রুটি খাইনা, রুটির বদলে তোমরা আমাকে শুকনো খেজুর আর খোরমা দিচ্ছ, আমাকে আমার ভাগের রুটি দাও, আমি রুটি খাবো”। সেই হাড়-জীর্ণ অভিনেতা এত নিখুঁত অভিনয় করেছেন, দৃশ্যটার শেষে আমি ভিডিওটা পজ করে ভাবছি, কি ছিলো এইটা! ঐ হাড়জীর্ণ লোকটা সিনেমায় একটা আলাদা কমপ্লেক্স ফিলিংস দিয়ে গেছে যা এককথায় অসাধারন।
প্রচুর ইউনিভার্সেল ডাটা থ্রো করা আছে সিনেমাটিতে, বিশেষ ভাবে তিরুমলের পাগলামী কথাবার্তায়, কুন্তির নির্বুদ্ধিতায়, সাধুর আত্বঃদর্শন আর তীর্থযাত্রার টাইমস্কেলে। কেন্দ্রীয় পুরুষ চরিত্রে উত্তম কুমার, তিনি সন্দেহাতীতভাবে একজন নন্দিত অভিনেতা, যিনি তিরুমুলের চরিত্রে রোল প্লে করেছেন। তিরুমুলের চরিত্রটা একদম ক্ষ্যামটা টাইপের, উন্মাদ বিদ্রোহীর মত, অট্টহাসিতে কাপিয়ে তোলে চারপাশটা, আর কুন্তি অনেকটা ধর্মপ্রান কট্টোর মতো, সে প্রার্থনা করতে ভালোবাসে, প্রকৃতিমাতার কাছে সে মনোপ্রানে তিরুমুলকে চায়, কিন্তু সিনেমার শেষে তার সেই চাওয়া বিমুখ হলে, ধিক্কার উঠে আসে, তার সেই ধিক্কারে আকাশ বাতাশ কেপে উঠে না, সে নিজেই আন্দোলিত হয়, ফলে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসে ‘তিরুমুল! তিরুমুল! শব্দের বিখ্যাত লাইনটি।
এদিকে মোশারফ করিম স্যারের কাছে খেলাধুলা কেবল খেলাধুলা, তাহলে স্যার, সিনেমা কেবল সিনেমা, নাটক কেবল নাটক, সংগীত কেবল সংগীত, বই কেবল বই, নির্বাচন কেবল নির্বাচন । বোকার স্বর্গে বাস করছি আমরা, ঘন্টার পর ঘন্টা হুদাই আমরা গান শুনি, সিনেমা দেখি, বই পড়ি, খেলাধুলা করি। আজকাল মানুষ কোন কারন ছাড়াই মোবাইল ফোন স্ক্রল করতে থাকে, কি পায় আসলে যতসব মিথ্যে কথার ভিজুয়াল টর্চারে, কেনো এত মানুষের আর্তচিৎকার? কেনো ৪৫ বছর বয়সের একজন সাধক কবি হতে চায়? সেদিন রেজাল্ট বেড়িয়েছে, কত মানুষ অভিনন্দন জানাচ্ছে একে অন্যকে? কিছু মা গোল্ডেন প্লাসের আনন্দে বিহব্বল তো, কিছু মা হতবাক! তাদের সন্তানকে কি শেখানো হচ্ছে এসব? গুগোলের সার্চবার! ঐটুকু বাচ্চা কি শিখছে এইগুলা! মাঝখান থেকে তিরুমুল চিৎকার করে উঠে, ‘চুপ রাহো ভাই- কিউ ইতনি বাকোয়াজ কারতে রেহতে হো ইয়ার, পজিটিভিটির মোড়কে তোমরা যা ইচ্ছে তাই করে যাচ্ছ! সত্যি লুকিয়ে মরুভূমির অলীক পাহাড় বানাচ্ছ! কেউ তোমাদের বলছে না - সাধুরা, দরবেশরা ঢপ মারছে, আজকাল তারা পরিসংখ্যান দেখায়, এটা হয়েছে সেটা হয়েছে, সোলার প্যানেলে ছেয়ে গেছে দেশ। বিদ্যুতের ব্যাবহার যে বেড়েছে, প্রতিবছর ইলেকট্রিসিটি কিনতে সাধুদের যে উপকৌঠন দিতে সেটা কমাতে তোমরা আজকাল ইউরেনিয়াম কিনতেছ, বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশুদ্ধ পানির লেয়ার কত নিচে নেমে গেছে তুমি জানো? পানি উত্তোলনের জন্য খোঁচাখুচিও কম হচ্ছে না? পানির গতিরোধ করে যে মরুকরণ হচ্ছে তা তোমাদের চোখে পরে না, ও তোমাদের তো মরু দরকার, বালু দরকার, সেই বালুতে কয়েকটা বাবলাগাছ লাগিয়ে দিয়েছ, যেন ক্ষুধার্থ কিছু উঠ এসে রক্তাত্ব মুখে তা চিবাতে পারে, ঐ যে দেখ, আমার কুন্তি মরুভূমিতে একফোটা জলের জন্য হিঙ্গুলা মাতাকে গালাগালি করছে! তিরুমুলের জন্য তার সেই চিৎকার কি কেউ শুনতে পাও?
টুয়েন্টি টুয়েন্টি-থ্রিতে এসে মারজুক দা কেনো এখনো মরুভুমির উত্তপ্ত বালি হাতাতে বলে? কিসের এতো হাতাহাতি! তুমি বেআব্রু হয়ে গেছ ভাই? তুমি না আবার কলম ধরলে, কখন লিখবে? যখন জেমস্ স্বর্গগত হবেন তখন, তোমার হাত কি ঐ মরুভুমির উত্তপ্ত বালিই হাতিয়ে চলছে, তোমার কলম চলছে না কেনো?






Comments
Post a Comment