নীলাভ পাখি
নীল পাখিটার চোখদুইটা সুন্দর, ঠোঁট টিয়াপাখির মতো বাঁকানো ছোট্ট ছোট্ট ধুসর, ডানায় নীল সাদার আঁকাবাকা সংমিশ্রণ। নীল লাভবার্ডটা সারাক্ষন খাঁচার এ মাথা ও মাথা ছুটোছুটি করে। লাভবার্টরা মুলত টিয়াপাখির গোত্রের, আকারে ছোট। নয় থেকে দশ প্রজাতীর লাভবার্ড দেখা যায়। কাকতাল ব্যান্ডের একটা গান আছে “আবার দেখা হলে” গানটায় ওরা বলছে, একটা উদাস নীলাভ পাখি নাকি লুকিয়ে আজো গাইছে! কাকতাল সুরের তালে যে নীলাভ পাখিটাকে উড়িয়ে দিয়েছিলো, সেটা নাকি নীড়ে ফিরেছে, কিন্তু একি কাকতাল এত নির্দয় কিভাবে হল, পাখিটার কিছু পালক কাঁচি ✂ দিয়ে কেটে ফেলা হয়েছে। একটা সময় যদিও সেরে উঠবে তবুও ডানাই তো পাখির সৌন্দর্য তাই না?
ভেবেছিলাম নীল রঙ্গের ছোট্ট লাভবার্ট টা মেয়ে, আর সাদাটা ছেলে, আকাশ বললো ভাই সাদাটা মেয়ে আর নীলটা ছেলে। অবাক হলাম, তাই নাকি কিভাবে বুঝলে? আকাশ বললো একটু মনোযোগ দিয়ে দেখেন! বুঝতে পারবেন। মনোযোগ দিয়ে দেখা শুরু করলাম। খাচাঁটির কোণায় ছোট্ট একটি মাটির কলসে লাভবার্ট দুইটা তাদের বন্দীসংসার মানিয়ে নিয়েছে। সাদাটা যে মেয়ে পাখি, সেটা খাঁচার পাশে গিয়ে দাড়ালেই বোঝা যাচ্ছে, কাছে গেলেই সাদা পাখিটা কলসের ভিতর গিয়ে বসে থাকে। তাও আবার উল্টো দিকে মুখ ফিরিয়ে! তাদের মধ্যে দারুন একধরনের কথোপকথন খেয়াল করলাম, নীল পাখিটা যেনো সাদা পাখিটার খেয়াল রাখছে, কি দারুনভাবে একে অন্যের সাথে ভাব বিনিময় করছে। বিপদের আশংকা দেখলেই নীল পাখিটা কিচিরমিচির শব্দ করে জানাচ্ছে আর সাদা পাখিটা কলসের মধ্যে লুকিয়ে উৎসুকভাবে তার পার্টনারের পরবর্তি সংকেতের অপেক্ষা করছে। আমি দীর্ঘক্ষন দাড়িয়ে তাদের এই ভাবের আদানপ্রদান দেখছি! কি অদ্ভুদ সৌন্দর্য এই প্রাকৃতিক ভাষার মধ্যে, কোন কপটতা নেই, নেই কোন চপলতা আর মিথ্যাচারিতা। এই সুন্দর দৃশ্যটা উপলব্ধি করার পর যদি কারো চোখের কোণায় জল চলে আসে ব্যাপারটা নিশ্চয়ই স্বর্গীয় হয়ে উঠবে। ওহ, স্বর্গীয় সুখ থেকে মনে হলো, চিরদুঃখী এই মানব সভ্যতা সুখের পিছনে ছুটতে থাকে, ক্ষনস্থায়ী সুখ অনুভব করার পর বুঝতে পারে, আরে এই সুখ তো ক্ষনস্থায়ী, আমার তো স্বর্গীয় সুখ চাই, যার রেশ কখনোই ফুরাবে না, স্বৃতির একটা পাতা ধরে টান দিলেই, নানান রঙ্গের দিন, নানান ঢঙ্গের কথা, কত নির্মল হাসি, সরল কয়েকটা চোখ।
লাভবার্ড দুইটার খাবারের দিকে চোখ পড়তেই মনে হলো, এরা কি তাদের চাহিদা অনুযায়ী খাবার পাচ্ছে? মানুষের খাবারে যেমন বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান থাকে সেরকম? আকাশ বললো ভাই, তারা সবকিছু ঠিকঠাক মতোই পাচ্ছে, কিছুদিন ধরে মেয়েপাখিটা কলস থেকে তেমন একটা বের হচ্ছে না, বোধয় ইমপ্রেগনেট হয়েছে, এজন্য কিছুদিন ধরে, এক্সট্রা যত্ন নিচ্ছি। বললাম, এমনও তো হতে পারে তারা তাদের পুষ্টিমান অনুযায়ী খাবার পাচ্ছে না। আকাশ বললো ভাই, আমাদের দেশে যতগুলো লাভবার্ড আছে সবগুলোই জেনেটিক্যালি দুর্বল, খাচাঁতেই সবসময় লালিত পালিত হয়। এদেরকে মুক্ত করলেও তারা স্বাভাবিক পরিবেশে বেশিদিন টিকতে পারে না। অবাক হলাম, জিঙ্গেস করলাম -তুমি কিভাবে জানলে? তুমি কি কখনো উন্মুক্ত করা কোন পাখিকে মরে যেতে দেখেছো? সে বলল, ভাই পাখি দুইটার খেয়াল রাখতে রাখতে জানতে পারছি। নিজেকে থামালাম, যাকগে, হতে পারে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম অনেক দিনতো পাখি দুইটার যত্ন করেছো, কখনো কি এমন হয়েছে, ওদের কে দেখে খুশিতে মন ভরে গেছে? সে বলল, ভাই ওরা কোহ্যাবিটেশনাল সিচুয়েশনে পরে, পাশাপাশি বসে যা যা করে তা দেখে মাঝে মাঝেই খুশিতে মন ভরে যায়। খুব অদ্ভুত ভাবে নীল পাখিটা সাদাটাকে যখন কোপুলেট করে, ব্যাপারটা অনেক উপভোগ্য, ঠিক মানুষের মতো নানা মুখভঙ্গী, বাক্য, কথা আর অঙ্গভঙ্গিতে সঙ্গীর দৃষ্টি আকর্ষন করা।
অবাক হলাম, তাই নাকি, তাহলে তো ব্যাপারটা সত্যিই ইন্টারেস্টিং। এদিকে ন্যাচেরাল ল্যাংগুয়েজ কিছুদিন ধরে মাথায় জেঁকে বসেছে। কখন তারা কোহ্যাবিটেশনাল সিচুয়েশনে যায়? সকালে?
"আমি বনের কাঠ হতে চাই কারণ আমি স্ব-ইচ্ছায় বাঁচতে চাই,
শুধুমাত্র জীবনের প্রয়োজনীয় তথ্যগুলি সামনে রাখতে, এবং দেখার জন্য যে,
সেগুলো আমাকে কি শিক্ষা দিচ্ছে।"
এখন ন্যাচেরাল কলস্, ন্যাচেরাল ল্যাংগুয়েজ আর কোহ্যাবিটেশনাল সিচুয়েশন দেখতে দার্শনিক থোরোর মত কাঠ হতে হয়ে খাচার সামনে দাড়িয়ে থাকা বোকামি। সেদিন সকালেই আকাশ টেনে নিয়ে গেলো, ভাই চলেন, একটা কিছু দেখাবো। তার টানাটানিতে বুঝতে পারলাম ব্যাপারটা কি? কাছে গিয়ে লাভবার্টদের যেভাবে দেখলাম, সত্যি ব্যাপারটা দারুন। নীল পাখিটা সাদা পাখিটাকে নানান কৌশলে ইনভাইট করছে। আকাশ আনন্দিত মুখে বলল ভাই দেখেন, নীল পাখিটা সাদাটাকে ভোলানোর জন্য কত রকম ন্যাকামী করছে? তার এই কথা শুনে মনটা কেন জানি খারাপ হওয়া শুরু করল। তাকে বললাম না রে ব্রো, এটা ন্যাকামী না, ওটা হচ্ছে ন্যাচেরাল কলস্ ইন ন্যাচেরাল ল্যাংগুয়েজ উইথ মাইন্ডফুল ইনভাইটেশন ফর কোহ্যাবিটেশনাল সিচুয়েশন। আমার কথায় আকাশ ভাবনায় পরে গেল, বেশ কিছুক্ষন পর জিঙ্গেস করল, ভাই আপনিওতো কয়েকদিন ধরেই পাখিদের সাথে সময় কাটাচ্ছেন, ওদের কে দেখে মন ভরে গেছে এমনকি কখনো হয়নি? আমি আকাশের এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না, গলা ধরে গেলো। অনেক প্রশ্নের উত্তর মানুষ নিরবতা দিয়েই চালিয়ে দেয়। মানুষের সেই নিরবতা বাস্তবতার উল্টোপিঠে রচনা করে চলে কোন ম্যানুস্ক্রীপ্ট।
বির্মূত :


Comments
Post a Comment