কারার ঐ লৌহ-কপাট
ছোটবেলা থেকেই এ আর রাহমানের গান খুব ভালো লাগে, রোজা সিনেমার- ইয়ে হাসিন বাদিয়া, ইয়ে খুলা আসমা” গানটার মিউজিক কম্পোজিশন দিয়ে এ আর রাহমান জায়গা করে নেয় অসংখ্য ভক্তের হৃদয়ে। তারপর তার ভক্তরাই তাকে খুঁজে নেয়া শুরু করে আর তিনি রচনা করে চলেন মিউজিকের মাইলস্টোন, গান যে মানুষের মনকে আন্দোলিত করে এ ব্যাপারটা তিনি অসংখ্যবার জানিয়ে দেন তার ভক্তদের। মোটকথা এ আর রাহমান- সুফিসং, মেলোডি, পেট্রিওটিজম,আর সিক্যুয়েন্টাল ইমোশনকে মিলিয়ে যে আধুনিক রকস্টার আমাদের উপহার দিয়েছে তার ছায়া আমরা আধুনিক বাংলাগানেও দেখতে পাই। আজম খানের সালেকা-মালেকা, এলআরবির দরজার ওপাশে, জেমসের আচঁল, শিরোনামহীনের ক্যাফেটেরিয়া গানে বাংলা রক গানের সাচ্ছন্দ্য আর সতন্ত্রতাকে বহন করে। এটা এক ধরনের নিজস্বতা। এটা বাংলা রক মিউজিকের একটা মৌলিক ব্যাপার। আমি সেদিন খুব মনোযোগ দিয়ে আজম খানের ‘সালেকা মালেকা’ শুনছি আর হাসছি, আজম খান লোকটার জন্য মনের মধ্যে আলাদা একধরনের রিসপেক্টেশন কাজ করছে, কি সুন্দর একটা ইমোশন লুকিয়ে ফেলেছে, সময়ের প্রয়োজনে, আব্বে গুরু আই সেলুট ইউ।
নজরুল নিজস্ব চেতনার মূর্ত প্রতিক
কৌলাশ দার- টুটা পারিন্দা, আর শিরোনামহীনের কৃষ্ণচূড়ার বিদায়মঞ্চ সবই আসলে আলাদা আলাদা পাবলিক ইমোশন নিয়ে চলে। এই পাবলিক ইমোশন ডিঙ্গিয়ে কৌলাশ দা যখন ‘মনের মানুষ খুঁজতে যায়, একটা সময় ঠিকই বুঝতে পারে ইমোশন আসছে না, এত কমপ্লেক্স ইমোশন স্রোতা ভক্তের কাছে প্রশ্ন হয়ে দাড়ায়।
এশিয়ান মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে এ আর রাহমান সবচেয়ে আলোচিত একজন, যিনি বিভিন্ন মিউজিক সিক্যুয়েন্সে ঢুকতে পারে, যার মিউজিক ভাইব্রেট, জেগে ওঠে গানের বিভিন্ন জায়গায়। শ্রদ্ধার সেই এ আর রহমান স্যার এটা কি করলো! নজরুলের কারার ঐ লৌহকপাটের, মা-বেহেন করে দিলো কেনো? এটা কি কখনোই সম্ভব যে, না জেনে, না বুঝে এরকম একটা ভুল হয়ে গেছে? এটা নিশ্চিত খুব ঠান্ডা মাথায়, জেনে বুঝে, সিক্যুয়েন্টালি করা হয়েছে। কিন্তু কেনো? তার ভক্তদের জন্য হতে পারে, নজরুল ভক্তদের জন্য হতে পারে, পিপ্পা সিনেমার প্রচারনার অংশ হতে পারে, অথবা হতে পারে শিক্ষার্থীদের হৃদয়ঙ্গম করার কৌশল। এগুলোর কোনটাই আসলে নয়! মুল বিষয় নজরুলের গানটা, গানের ‘দাদরা’ স্টাইলটা, গানটায় লুকানো ইমোশনটা, প্রতিটা ছন্দের ভাঁজে সাজানো সিক্যুয়েন্সটা আর দরদের নিয়ন্ত্রন করার কৌশলটা। এই গানটা আমাদের মুক্তির মন্ত্রনা দেয়। এ যাবৎ যতজন “কারার ঐ লৌহকপাট” গাওয়ার চেষ্ঠা করেছে, বা গেয়েছেন, সবাই আসলে জানে, নজরুল নিজস্ব চেতনার এক মূর্ত প্রতিক।
হাঙ্গার স্ট্রাইক আর রাষ্ট্রযন্ত্রের বিষবাষ্প;
নজরুলের “কারারঐ লৌহকপাট” প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২১ সালে, প্রকাশের তিনবছর পর নিষিদ্ধ করা হয় এই গানকে, এরপর নিষিদ্ধ করা হয় “প্রলয় শিখা” বদলানো হয় গান আর কবিতার অনেক লাইন, মুছে দেয়া হয় বিদ্রোহীর “মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে, রাজ রাজটীকা, দ্বীপ্ত জয়শ্রীর’ মত সুন্দর সুন্দর লাইন।
এই সেন্সরের প্রয়োজনীয়তার হাত ধরে নজরুল হয়ে উঠে হাঙ্গার স্ট্রাইক আর রাষ্ট্রযন্ত্রের বিষবাষ্প।
১৯৭০ সালে জহির রায়হানের “জীবন থেকে নেয়া” সিনেমায় ‘কারার ঐ লৌহকপাট’ বাঙ্গালীর মনে আরেকবার আগুন ধরিয়ে দেয়। বাঙ্গালিরা যেন নব-জাগরনে জ্বলে উঠে। সেদিন নজরুল কুমিল্লা থেকে কলকাতায় ফিরে যে ক্ষুধা, নিপিড়ন আর নির্যাতনের শিকার হয়ে কারার ঐ লৌহকপাট ভেঙ্গেছিলো, যে অনুভুতি দিয়ে আচঁর কেটেছেন অসংখ্য মানুষের মনে, সেই আচঁরের ক্ষত, সেই দাগ, সেই স্বৃতিচিহৃ সবই মুছে গেছে, কিন্তু গানটার অনুভুতিটা একটুও কমেনি, আর একবার সকল বাধন ছিড়ে, সব প্রাচীর ভেদ করে গেয়ে ওঠো, পুরো অনুভুতিটাই তুমি ফিরে পাবে, ট্রাস্ট মি এটা একটা ইন্দিয়তার ব্যাপার।
আজকাল বাঙ্গালীরা গান গায় না, কয়েকটা ছোটভাই নিজের টাইমলাইনে নিজেদের ধীক্কার দেয়, একটা ঘুনে খাওয়া, ঝিমধরা জেনারেশন পেয়েছি আমরা! আমরা তো এমন না! কই আমাদের সৌন্দর্য? হিরো আলম? সে তো রবিন্দ্রনাথের তেওড়া তালে মেলোডি গেয়ে উঠে। শুনতে জগাখিচুড়ীমুলক কোন কিছু হয়ে উঠলেও সোসাল মিডিয়ার তেলবাজিতে পরে দুন্দুভি ঢাক পেটানো হয়। কেউ তাদেরকে বলে না ঐ যে দুন্দুভি ঠাক দেখছ, ওটা এলোপাথাড়ি পেটানোর জন্য নয়, ঐ ঠাকে যখন কেউ তাল তুলবে সেটা স্পন্দিত করবে তোমার হৃদপিন্ড, আগুন জ্বলবে তোমার রক্তে। এদিকে বড় বড় মিউজিশিয়ানদের মাথা খালি হয়ে যায়! ইয়েসাব কিয়া হ্যা ভাই, কোয়ি তো রোকো উসে’ তুমলোক রোকোগে নেহি তো ফের ঠিক হ্যা, হ্যাম উসে জারুর বাতায়েঙ্গে, থোরা সাবার কারো, একটা গানের রুটিন চেঞ্জ করলে ভাবের কি পরিবর্তন হয় সেটা তোমরা সময় আসলেই জানতে পারবে? আজ কিছুদিন ধরেই পিপ্পা সিনেমায় নজরুলের ভাঙ্গার গান শোনার পর, আমরা সবাই খুব ক্লিয়ারলি ব্যাপারটা বুঝতে পারছি? কিন্তু বুঝতে পেরে কি লাভ! কেউ কি কণ্ঠভর্তি দরদ আর ভেতর থেকে উধলে ওঠা ইমোশনকে কাবু করে গেয়ে উঠতে পারছে? না, পারছে না? সবাই অটোটিউনিং এর খপ্পরে পরে গেছে।
মিউজিকের টাইমস্টেপস;
আমি গানের স্বরলিপি বুঝিনা, সারেগামাপাও বুঝিনা, খুব অল্প কিছুদিন আগে মিউজিকের টাইমস্টেপসে্র সাথে পরিচয় হয়েছে। একজনের কাছে নজরুলগীতি শুনেছিলাম, খালি গলায়। মনে হয়েছিল খুব সুকৌশলে কেউ একটা কমপ্লেক্স ইমোশন কমপ্যাক্ট করে রেখেছে। তারপর- সেই চিরচেনা ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে” আরে ভাই, কি অদ্ভুত! নজরুলের গাওয়া স্টাইলের বাইরে তুমি সেটা গাইতেই পারবে না, ভাবের চলমান গতি থেমে যাবে। একটু আলাদা তালে গাইতে গেলে তালের সৌন্দর্য হারিয়ে যাবে। বছর ছয়েক আগে ‘দেবোনা ভূলিতে’ নামের ব্যানারে পাঁচজন (শোভন, তিমির, ইমাম, কিনজল আর তীর্থের গাওয়া গানটা ছিল সুন্দর, সেইসময়ই আর্টসেল অথবা এসময়ের নোবেল, যারাই গানটা গেয়েছে তাল ঠিক রেখেই গানটা গেয়েছিল। কিন্তু এবার কি হইলো এইটা?
মাঝখান থেকে ইউটিউব আজকাল তাল শেখাচ্ছে- দাদরা, ত্রিতাল, কাহারবা, ঝাপতাল, রুপক, তেওড়া, আরো কতকিছু। আজকাল আধুনিক ইউটিউব সিঙ্গাররা তাল পরিবর্তন করতে পারে না, গিটারের একতালে সিমিলার যে কয়েকটা গান আছে তা গায়, অথবা একই তালে গেয়ে ওঠে কয়েকটা নতুন গান আর সেটাই মনের মধ্যে বাজতে বাজতে একটা সময় হারিয়ে যায়। তালপাতার সেপাইরা আমাদের একতালে নিয়ে কিছুদিন মাইন্ডের টেক কেয়ার করে। তারপর, তারাই একটা সময় ত্রিতালে পড়ে নিজেকে আরো কোলাবরেটিভ করার চিন্তা করে। অথচ আমরা স্রোতারা হারিয়ে যাওয়া সুর খুঁজি। কোথায় সেই সুর যা রক্তে আন্দোলিত হয় , কোথায় সেই তাল যা মন মগজে আগুন ধরিয়ে দেয়?
ধুর বার্কলির মিউজিক স্কুল থেকে ইয়ামাহার মিউজিক স্টুডিওতে পৌছাতে পৌছাতে গানটার এরকম নৃশংসভাবে খুন হয় নাকি? এটা খুব ঠান্ডা মাথায় করা হয়েছে, সেদিন কারা যেন চিৎকার করেছিল, “কিছু সুর তুমি এনে দাও পাখি নাগরিক কোলাহলে” তাদের জন্য?
Nazrul's poetry;
Nazrul's poetry reflects a strong spirit of rebellion against oppression and injustice, advocating for social equality and human rights. Apart from his poetry, Nazrul composed numerous songs, establishing himself as a prolific songwriter and musician. His compositions, often inspired by diverse musical traditions, contributed to the cultural richness of Bengal. Kazi Nazrul Islam's legacy extends beyond his artistic contributions; he was a symbol of resistance and a voice for the marginalized, leaving an indelible mark on Bengali literature and culture.


Comments
Post a Comment