সত্যের প্রকাশে প্রচ্ছন্নতা
মানুষের মধ্যে দুইটা রুপ থাকে, একটা ইন্ট্রোর্ভাটনেস অপরটি হল এক্ট্রোর্ভাটনেস। সহজ বাংলায় বলতে গেলে মৃন্ময়ী আর চিন্ময়ী অথবা চেতনা ও মন। চিন্ময়ী মানুষেরা চিত্তের প্রাধান্য দেয় বেশি, এরা হয় বাসের ড্রাইভার টাইপের, যেখানেই যায় সিচুয়েশনটা নিজেই কন্ট্রোল করার চেষ্ঠা করে, এদের সবচেয়ে উপকারী দিক হল এরা সহজে ভেঙ্গে পরে না। অপরদিকে মৃন্ময়ী মানুষেরা হয় মন নির্ভর, এরা মুলত প্যাসেন্জার টাইপের, নিজেকে নিজের মধ্যেই লুকিয়ে রাখে, সবসময় সিচুয়েশনের মধ্যে নিজেকে এ্যাডাপ্ট করার চেষ্ঠা করে, এদের সবচেয়ে ভালো দিক হল- এদের কনশিয়াসনেসের ফোকাস করার ক্ষমতা অনেক বেশি।
চেতনা ও মনের ঝগড়া;
এই তো সেদিন মন আর চেতনার তুমুল ঝগড়া বাধলো। ঝগড়ার বিষয় 'ছায়া'। চেতনা বললো, এইতো আমার ছায়া, আমি যেদিকেই যাচ্ছি ছায়াও পাশে পাশে যাচ্ছে, আমি যখন নড়াচড়া করছি ছায়াও নড়াচড়া করছে, আর তুমি বলছো ছায়া বলতে কিছু নেই? মন বলছে শোনো, ছায়া বলতে আসলেই কিছু নেই, দেখো, সূর্যের যে আলোটুকু তোমাকে ভেদ করতে পারছেনা সে অংশটিতে যে অন্ধকার হচ্ছে, তাকে তুমি ছায়া বলছো, অথচ সুর্যের স্থান পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই অন্ধকারটুটুও পরিবর্তন হচ্ছে, এক্ষেত্রে বিদঘুটে অন্ধকারে, যখন তুমি নিজেকেই দেখতে পাবে না অথবা রঞ্জেন আলো যখন তোমাকে ভেদ করে উল্টো দিকে আলো ফেলবে, তখন তো কোন অন্ধকার থাকবেনা তখনও কি তাকে ছায়া বলবে।
চেতনার কাছে ব্যাপারটা খুবই সত্য মনে হল, যেন কোন উদ্ভাসিত আলোড়ন, কিন্তু আবার একটু ভালো করে ভেবেই বলে উঠলো - বুঝলাম রঞ্জেন আলোয় ছায়া পরেনা, বিদঘুটে অন্ধকারে ছায়া অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে স্বাভাবিক আলোয় যে অন্ধকারটুকু পরছে তাকে আমরা কি বলবো, 'ছায়া' ছাড়া। মন যেন একটু নড়েচড়ে বসল কি যেন ভেবেই বলা শুরু করল, যে জিনিসটা আলো ছাড়া তৈরী হয় না, তৈরী হতে পৃষ্ঠতল প্রয়োজন, আবার কিছু কিছু আলোতেও হাড়িয়ে যায়, আলোর পরিবর্তনের সাথে সাথে তারও পরিবর্তন হয়, আবার ঐ অন্ধকারটুটুর যেহেতু কোন নিজস্বতাই নেই, তাকে কোন নামে ডাকার কি কোন প্রয়োজনীয়তা আছে।
জানোই তো, চেতনা এক্ট্রোর্ভাট, ক্ষেপে গিয়ে বলল নিজস্বতা নেই মানে কি? আমি চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি অথচ তুমি বলছ এটার কোন নিজস্বতা নাই, কোন নামই দেয়ার প্রয়োজন নাই , এটা কি ধরনের কথা। আমি কি আমার চোখকে অবিশ্বাস করবো, নাকি তোমার আজাইরা কথা শুনবো।
মনতো ইন্ট্রোর্ভাট, ভয় পেয়ে চুপসে গেলো, কিন্তু নিজেকে থামাতে পারলো না, একা একা ভাবতে লাগলো, হায়রে চিত্ত আমি যে কেনো তোমার ছায়াকে, 'ছায়া'বলতে নিষেধ করছি, তুমি যদি জানতে, তুমি যদি ছায়াকে 'ছায়া' না বলতে, তাহলে দেখতে, তিনটি অবজেক্টের লোকেশন রোটেশনে এই আলো আধারের অদ্ভুত খেলা। দেখতে পেতে মহাশুন্যেও লোকেশন রোটেশনের এই অদ্ভুত খেলায় চন্দ্রগ্রহন, সুর্যগ্রহন, দিন-রাত্রি, জোয়ার-ভাটা, আহ্নিকগতি-বার্ষিকগতি, পৃথিবীর তাপমাত্রা, বাতাসের গতিবেগ, আমাদের বিচরন আরো অনেক কিছু। মন ইন্ট্রোভার্ট হওয়ার কারনে নিজের ভাবনাগুলোকে নিজের মধ্যেই সাজাতে লাগলো। যখনি সে নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্ঠা করতো চেতনার এক্সর্টোর্ভাটনেস তাকে দমিয়ে রাখা শুরু করলো। কারন- চেতনা এতো কমপ্লেক্সসিটি পছন্দ করে না।
দিন যেতে লাগলো, চেতনা তার এক্ট্রোভার্টনেস কে ব্যাবহার করে ধীরে ধীরে বস্তুজগতের সফলতা পেল, অপরদিকে মনকে লোভী, স্বার্থপর, সুযোগসন্ধানী, পাগল, অযৌক্তিক যুক্তিবাদী, নানাভাবে অপমানিত করতে থাকলো। মন বেচারা অসহায় হয়ে গেল, সে তার কথাগুলোকে আর প্রকাশ করতে পারলো না, কিন্তু সেও তো চেতনারই অংশ, সুতরাং যখনই চেতনা কোন ভুল করতো, দ্বিধাদ্বন্ডে পরে যেত, মন তাকে থামাতো, তাকে বোঝাতে গিয়ে বারবার অপমানিত হতো ।
সত্য ম্রিয়মাণ, প্রচ্ছন্ন, যখনই সত্য প্রকাশিত হয়, চেতনার মধ্যে নতুন আলো উদ্ভাসিত হয়, সময় যতই যেতে থাকে চেতনার সেই অন্ধকারটুকু সত্যের আলোটাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে, একটা সময় অন্ধকারটাই সত্য আর আলোটাই মিথ্যা হয়ে যায়।
সত্য নাজুক ও ম্রিয়মাণ;
সত্য আসলে খুব নাজুক, যেন হাওয়ায় টিকে থাকা মোমবাতি। অনেকদুর থেকে খুব ক্ষীণ আলোর মত, কাছে যেতেই একটা সময় আলোটা যেন নিজেকে উদ্ভাসিত করে। সত্য এতো বেশী স্পর্শকাতর ছুয়ে দেখতে গেলেই মিথ্যের মত শোনা যায়, সত্য ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। এ তো মহা বিভ্রান্তিকর, তাহলে কি সত্য নেই? কেউ কি সত্য কথা বলতে পারবে না? সত্য বললেই যদি কিছু মানুষের বিপক্ষে যায়, কারো সফলতায় হিংসে করা হয়, নিজের স্বার্থসিদ্ধির কারন হয়ে দারায়, স্বাভাবিক গতিতে গোন্ডগোল বেধে যায়, উস্কানিমুলক কথাবার্তা হয়ে যায়, তাহলে কি মানুষ সত্য কথা বলবে না? সত্য কি সবসময় অপ্রকাশিতই থাকবে?
সত্য অবশ্যই আছে। আমরা তাকে সামাজিক নেগেটিভিটি দিয়ে ঢেকে রেখেছি। এই সামাজিক নেগিটিভিটি বিষয়টা এতো খারাপ যা একজন মানুষের সারাজীবনের কষ্টে অর্জিত মহামুল্য জ্ঞানকে খুব সহজে নেগিটিভিটিতে পরিনত করতে পারে। এই সামাজিক নেগিটিভিটি এত ভয়ংকর যা খুব সহজেই সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বানায়। এই সামাজিক নেগিটিভিটি আমাদের হাতে পায়ে খুব মজবুত এক অদৃশ্য শেকল পরায়, এই অদৃশ্য শেকল একটা সময় এতো বেশি মজবুত হয়ে যায় যখন আমরা আমাদের প্রাণের ছোট্ট সোনামনির হাতে খেলার পুতুল তুলে দিতেও দ্বিধাদন্দে পরে যাই। এ অবস্থায় আর শেকলটা ভাঙ্গা যায় না, ভাঙতে চাইলেও যে শক্তির প্রয়োজন তা আমরা আর জোগাড় করতে পারি না।
চেতনার জয়;
আমাদের চেতনাকে জানানো উচিৎ, আমরা যা দেখছি, যা জানতেছি, যা বুঝতেছি তার অনেক কিছুই সত্য নয়। এতে অনেক শুভংকরের ফাঁকি আছে। মনের অনেকগুলো অর্গান থাকে, যা আমাদের কে সত্য উপলব্ধি করা শেখায়, যা আমাদেরকে ভাবতে শেখায়, ভালোবাসতে শেখায়, সবকিছুকে সহজভাবে গ্রহন করতে শেখায়। মনের সেই অর্গানগুলোকে খোলা রাখতে হবে যেন নিজের ভেতরে সত্য প্রবেশ করতে পারে, তাকে লালন করতে হবে। দেখা যাবে আমাদের মধ্যে লালিত এই সত্যই একদিন আমাদের মধ্যে জমে থাকা বিদঘুটে অন্ধকার সরিয়ে আলো নিয়ে এসেছে।
কী-ওর্য়াড
চিন্ময়ী, চেতনা, মৃন্ময়ী, চন্দ্রগ্রহন, সুর্যগ্রহন, ম্রিয়মাণ, দিন-রাত্রি, জোয়ার-ভাটা, আহ্নিকগতি-বার্ষিকগতি, পৃথিবীর তাপমাত্রা, আমাদের বিচরন, সামাজিক নেগেটিভিটি, অদৃশ্য শেকল, বস্তুজগত



Comments
Post a Comment