পাঠশালা

 পাঠশালায় দাদু আজ আমাদের পাশে বসে আছে! ও দাদু তুমি আমাদের পাশে বসলে ঋতুর গল্প বলবে কে? দাদু মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু হাস্যে বললেন আজ তোদের গল্প বলবেন ঐ যে দেখছিস দুইজন, সৈনিকের পোষাক পরিহিত একজন হচ্ছে ডিলুশনাল দর্শনময় বিদ্রোহের কবি আর একজন আলখাল্লার উপরে কালো এ্যাপ্রন পরে এ্যানলাইগট্যান্ড বিজ্ঞানময় ঠাকুর দাদা। 

ও দাদু বিদ্রোহের কবি যুদ্ধের পোষাক পরে আছে কেনো? দাদু পিঠে হাত বুলিয়ে বললো বিদ্রোহীর কন্ঠে আছে ধার, তার কথায় রক্ত কেপে উঠে, মানুষের অন্ধ চোখে আলো উকি দেয়, তার গলার সাম্যের ওংকার সংগীত প্রতিটি মানুষের মনের অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা প্রশ্নগুলোকে জাগিয়ে তোলে। এই অপরাধে একটা সময় পৃথিবী তার গলা চেপে ধরবে আর এজন্যই বোধয় বৃদ্ধ বয়সে বিদ্রোহীর কন্ঠে আর তেজ থাকবেনা। 

দাদুর মুখে বিমর্ষতা দেখে মনে হল দাদু এই প্রসঙ্গে মর্মাহত হয়েছে। জিঙ্গেস করলাম দাদু ঠাকুরদার হাতে ঐ বইটার কোন নাম নেই কেনো? দাদু বিমর্ষতা কাটিয়ে বলে উঠলো- ওটা ম্যানুস্ক্রীপ্ট ওটার কোন নাম হয় না। ধরে নে, ঐ ম্যানুস্ক্রীপ্টে রয়েছে আমাদের জগতের সকল কথা, মানে যারা মরে গেছে, আমরা যারা বেঁচে আছি, এবং যারা আসবে তাদের সকলের কথা, আমরা যখন ঐ ম্যানুস্ক্রীপ্ট থেকে কোন ব্যাক্তির কোন উক্তি, কোন বাক্য, তার জীবনচরিত্র নিয়ে আলোচনা করি অনুভব করো তোমার কাধে তাদের একটা অদৃশ্য হাত, অনুভুত হবে। কিন্তু ঐ ব্যাক্তির অদৃশ্য হাত ধরে তাকে টেনে হিচরে কোন ভাবেই এই বর্তমান সময়ে নিয়ে আসতে পারবে না। তাহলে তার সাথে ভুত চলে আসতে পারে।

বির্দাথীদের কোলাহলে আড়মোড়া ভাঙাতে বিদ্রোহের কবি বলে উঠলেন, এই যে মহাবিশ্ব এর মধ্যে যা কিছু দেখছো তার সবই একটা একক মহাশক্তি বা তাতে একটা সিঙ্গেল অরিজিনিটি বিদ্যমান। সেই একক মহাশক্তিকে ঘিরে বহুকিছু এসেছে। এই যে মহাবিশ্বের এই একক মহাশক্তি কি মৃন্ময়ী নাকি চিন্ময়ী। এই মহাজগৎ কি অন্ধ জড়বস্তুর বিকাশ নাকি এই চেতনারই স্বরচিত বিলাসিতা? এই সমস্যাটা নিয়েই তো ডিলুশনাল দর্শন আর এ্যানলাইগটেন্ড বিজ্ঞানের ঝগড়া চলছে যুগ যুগ ধরে। বিজ্ঞান এখনো অন্ধ জড়বস্তুর রাজক্ত ছেড়ে চেতনার দিপ্তীমান রাজ্যে প্রবেশ করতে পারেনি। বিজ্ঞানীরা অন্ধ জড়বস্তু ও এর অভিব্যাক্তির সাধনলাভের মধ্যেই কি সীমাবদ্ধ নয়? কিন্তু ডিলুশনাল দার্শনিকেরা এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। দার্শনিকেরা মনে করে এই সমস্ত মহাবিশ্ব জ্ঞানময় মহাশক্তির চেতনারই অভিব্যাক্তি।

বিদ্রোহীর কথার জের থেকেই ঠাকুরমশাই সকলের উদ্যেশে বলে উঠলো, জড় বিজ্ঞানের মুলে রয়েছে সমগ্র পৃথিবীর কন্ঠস্বর মহাবিজ্ঞান।  শক্তির সবখানে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়বস্তু জড়িয়ে থেকেই এই জীবনময় জগতকে প্রকাশ করছে। মুলত জগত জড়শক্তিরই খেলা। ঠাকুরমশাইয়ের মাঝখানে বিদার্থীদের একজন বলে উঠলো, "ঠাকুরদা জগতটা আমাদেরই জড়তার প্রসবজাত অন্ধ হনুকরন"

বিদ্রোহীর কন্ঠে যেনো তেজ ভর করলো, যতদুর মনে পরে দার্শনিকেরা সেই অতিত কাল থেকেই আমাদের অন্ধ জড়তা আর জীবনের সংবেদনশীলতাকে, মানব চেতনা শক্তির অভিব্যাক্তি হিসেবেই জেনে আসছে।

ভূ-পৃষ্ঠে স্থাবর-অস্থাবর যা কিছু দৃশ্যমান, এমন কি আমাদের অজান্তে সঙ্গপনে যা কিছু ঘটে চলেছে তার সবকিছুতে রয়েছে চেতনাময় মানুষেরই অধিষ্ঠান। সেই অধিষ্ঠানে যখন আমরা অধিষ্ঠিত হতে শিখি দেখতে পাই সকল জাগতিক পদার্থে আমাদেরই অভিব্যাক্তি। মানব মনের এই অভিব্যাক্তিগুলো যারা অনুভব করতে শেখায় তারা মহামানব অনেকটা বৃত্তের বিন্দুকে কেন্দ্র করে এর পরিধি সংকোচন ও প্রসারনের মত। আর এজন্যই দর্শন মহামানবদের ক্ষেত্রজ্ঞ বলে থাকে, মানুষ যখন এই ক্ষেত্রে অধিষ্ঠান করা শুরু করে সে হয়ে উঠে ক্ষেত্রজ্ঞ। 

ঠাকুর মশাই যেনো বিদ্রোহীকে উপদেশ দিয়ে বলে উঠলেন, সমস্ত ক্ষেত্রেই নিজেকে ক্ষেত্রজ্ঞ বলে জানবে, মনে রাখতে হবে এতে তোমার ক্ষয় হতে পারে, সংশোধন,প্রসারন, পরিবর্ধন, পরিশোধন অনেককিছু হতে পারে, যদি এমনই হয় ধরে নিও সংশোধন তোমার না, তোমার অবচেতনের, তোমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অন্ধ জড়তার, এটাতে তোমার কোন হাত নাই। এই অন্ধ জড়াতাকে বোঝার জন্য বাঙ্গলা ভাষায় খুব সুন্দর একটা শব্দ আছে 'অপরাপ্রকৃতি'। আচ্ছা এই অপরা প্রকৃতিটা কেমন? আমাদের সংবেদনশীলতার যেসব জায়গায় আমাদের চেতনা উপস্থিত থাকে যেগুলো থেকে আমরা ভালো মন্দ নির্ণয় করতে পারি ওগুলো আমাদের পরা, চিৎ বা প্রপঞ্চক প্রকৃতি বাকি যতকিছু আমাদের অবচেতনায় ঘটে চলছে তা হল অপরা প্রকৃতি। আরো সহজ করতে গেলে সমগ্র সৃষ্টিই আমাদের চেতনা ও অবচেতনারই প্রকাশ। সকল পদার্থের মুলকথা ও প্রানের প্রাণসঞ্চারী শক্তি, সবকিছুতেই আমি।

ঠাকুরমশাইর কথার নিরবতায় বিদ্রোহী বলে উঠলেন,

সুর্যের যে তেজ বা দীপ্তি যেমন জগতকে উদ্ভাসিত করে তেমনি মানুষের মধ্যে থাকা মানুষিক শক্তিই আমাদের জগতটাকে উদ্ভাসিত করে। আমিই জলের প্রতিচ্ছায়, তো আমিই মেঘের গর্জনে স্রষ্টাকে খুঁজতে থাকা অবচেতন, আমিই পুরুষের চেতনায় পুরুষত্ব তো আমি অবচেতনায় প্রকৃতির সাথে মিশে থাকা জীবনসত্তা।

যে আমি মশাল হাতে আলোর পিছনে ছুটছি সেই আমিই তো প্রাণীজঠরে প্রবেশ করে নিজেকে নতুনরুপে প্রকাশিত করছি, জগতের অন্যসকল প্রানকে খাদ্যরুপে ভক্ষন করছি আর শক্তি সঞ্চয় করছি সুতরাং ভেতরে আমি বাইরেও আমি, আমিময় এই ত্রিভুবন। 

ঠাকুরমশাই একই স্বরে বলে উঠলেন, নানান সৃষ্টিকর্মে আমি ব্যাক্ত আবার চরাচরে আমি প্রচন্ডভাবে অব্যাক্ত। জীবনের লীলাখেলায় আমি এই নস্বর দেহে বাস করছি অথচ আমার নিত্য চেতনার স্বরুপের বিচ্যুতি হচ্ছে না। আর এভাবেই আমি মহামানব। এই মহামানব রুপে আমিই উদ্ভাসিত আবার কুঞ্চিত, শব্দে অথবা নিরবতায়, চেতনায় আর অচেতনে। আমি নিত্য প্রকাশিত আবার মারাত্বকভাবে অপ্রকাশিত। আর এভাবেই আমি নিজেই আমার মানব প্রকৃতির শাসক ও ভাষক।

এবার বিদ্রোহী তার কন্ঠে জোর নিয়ে এলেন বললেন, পুরুষোত্তম সত্য, আমাদের এই পৌরুষত্ত, এই প্রকৃতি, অবচেতন অন্ধ জড় ও চেতনাময় জীবের প্রান সবই এক একক মৌলিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। অন্ধ জড়তার প্রপঞ্চকতা আর জীবের জীবন এগুলো শুধু প্রকারভেদ মাত্র। আত্বজ্ঞানের পরিপূর্ণতাতেই মুলত পরমাত্বার আবির্ভাব এবং এই জীব ও জড়র প্রকৃতির সত্য বিগ্রহতেই আবার পরমাত্বা বিলিন হয়ে যায়। 

সেদিন যারা সত্যকে ভেদ করেছিল তারাই তো আমাদের জানালো, ভুলোমনের ভেদ করে সবাই তো আর অকিঞ্চিত হতে পারে না অনেকের ক্ষেত্রে ভুলোমনটা ডিলুশনাল, বিদ্রোহীর। এই ভুলোমনটা যেমনই হোক এটাই মুর্ত্ত বা অমুর্ত্তরুপে, কখনো ব্যাক্ত বা অব্যাক্তরুপে, বিজ্ঞান বা অবিজ্ঞানরুপে, সৎ ও সত্যের পথে প্রকাশিত হয়। আমাদের ব্যাক্ত ও মুর্তরুপই বিজ্ঞানের আর অব্যাক্ত, অমুর্ত্ত, চিন্ময়ী রুপ দর্শনের।


ছুটির ঘন্টা বেজে উঠলো, সবাই অদৃশ্য হয়ে গেলো, আমি আর দাদু গায়ের মেঠো পথ ধরে বাড়ি ফিরছি, দাদু যেনো বিদ্রোহী ঠাকুরের আলোচনাতেই ডুবে আছে, দাদুকে জিঙ্গেস করলাম দাদু তাহলে কি দাড়ালো, তত্ত্বজ্ঞানের পথে বিজ্ঞানের পরিক্ষা নিরিক্ষা যেখানে শেষ ওখানেই তো দর্শনের পদচারনা শুরু তাইনা? দাদু সম্বিৎ ফিরে পেলেন, স্মিতহাস্যে বললেন- না রে মনু, দার্শনিকেরা আমাদের যে সহজ সরল বিধির পথ দেখায় তা বুঝতে না পেরে আমরা আবার মনুর পায়েই মাথা নোয়াই, স্রষ্টার পূজা করতে গিয়ে সৃষ্টিকে ভুলে যাই অনেকটা বাছুরটাকে মেরে ফেলে গাভীর দুধ দোওয়ানোর চেষ্ঠা করার মত ব্যাপার! অথচ বিজ্ঞান মন্থরগতিতে চললেও একটা সময় ঠিকই সত্য প্রকাশ করবে তখন আর মনুর পায়েও মাথা নোওয়াবার অবকাশ থাকবে না, আচ্ছা তখন আমরা কিসে মাথা নোওয়াবো?


#Monotheism_in_individuals






Comments