খতিয়ান


 "শৈশবে এক জোনাকিকে খুন করেছিলাম বলেই কি? পৃথিবীতে এত অন্ধকার! - প্রবর রিপন

~প্রবর রিপন স্যারের এধরনের কথায় উঠে আসে পাপবোধের সুক্ষ্ম আক্ষেপ। মনে পড়ে যায়, ফেলে আসা ছোট ছোট ভুল। যা শোধরাতে চেয়েও শোধরাতে পারি নি। এক বিদঘুটে কালো পাপাত্বা যেনো খুলে দিয়েছিলো মহাকালের পথ।

চিরকুটে সুকুমার;

এক ভীষণরকম বিষন্নতার শহরে পৌছে গেছি আমি, এখানে কেউ খুনি নয়, সবাই যেনো ধবধবে সাদা জুব্বা পরিহিত কিছু হুব্বা। রাজপথে ডিমনস্’রা ঘোরাফেরা করেনা আর! ইমাজিনের ড্রাগনেরা অলিতে গলিতে চিৎকার করে, ‘আই বেট মাই লাইফ ফর ইউ’। কি নিঃসঙ্গতায় কন্ঠরোধ হয়ে আসে আজকাল, খেলারাম খেলে যায়, ডলারাম ডলে যায়, আর প্রজাপাড়ায় নিথুরাম মাথা চুলকায়, হা হা হা হা। চিরকুটে লেখা সুকুমার বৃত্তির কবিতা -


মুক্ত কর ভয়,

আপনা মাঝে শক্তি ধর,

নিজেরে কর জয়


কবিতাটার এই তিনটা লাইন সবসময় একধরনের ভালোলাগা উপহার দিয়ে যায়। সেই অনুভুতি এই অন্ধকার ধরনীর অমাবস্যায় মলিন হয়ে গেলে মনে পড়ে রুদ্র’দার কবিতা-


     “আর যাই হোক পলাতক নই-

     হয়তো পারিনি জীবনের সব প্রাপ্য মেটাতে

     হয়তো অনেক অনিয়ম এনে গড়েছি নিয়ম

     হয়তো স্বজন প্রিয় মানুষের নিষেধ মানিনি,

     বন্ধন ছিঁড়ে ব্যবধানকেই আপন ভেবেছি বেশি


খতিয়ানে সিগনেচার;


এসব আসলে একটা ছেড়া খতিয়ানের কাছে কিছুই না, সেই জীর্ণ খতিয়ানটাতে এমন কিছুই লিখা ছিলো না, যা বারবার ভাবিয়ে তুলবে, সহজ সরল কয়েকটা লাইন, কি অদ্ভুৎ অনুভুতি তার। আধুনিকতার ছোয়ায় সেদিন সেই ছেড়া খতিয়ানটা আমি এখনো পাইনি, নিজেকে প্রবোধ দেয়ার জন্য খতিয়ানের হার্ডকপিটা আমি আজো খুঁজে ফিরছি, ডাকবিভাগের অচল রহস্যে সেই খতিয়ানটা কোথায় হাড়িয়ে গেছে, কেউ জানে না। ডাকবিভাগের রানাররা আর মলিন খতিয়ানের হার্ডকপিতে একবুক ভালোবাসা নিয়ে ছুটে চলে না, নগদেই আজকাল তাদের ভালোবাসার ব্যাবসা হয়। কিন্তু সেই খতিয়ানটার নিচে তো তার সিগনেচার ছিলো, কিভাবে সেটাকে মিথ্যা বলবো, এজন্যই সেদিন -তার কাছে সেই খতিয়ানের কয়েকটা লাইন এতো মুল্যবান হয়ে দাড়িয়েছিলো? 


বিরহভূমির কৃত্রিম বৃষ্টি;


সেদিন খাঁচায় বন্দি দুটো পাখির সৌন্দর্যে খুইয়ে ফেলেছিলাম নিজেকে, আজ অসংখ্য পাখির কোলাহলে হটাৎ মনে হলো, পাখিদের এই বিপুল কোলাহলের তো কোন সংজ্ঞা হয় না, এই বিপুল প্রকৃতিকে তো খাঁচায় আবদ্ধ করা যায় না, কোন ফ্রেমেই বন্দি করা যাচ্ছে না এই সুন্দর প্রকৃতিকে, অল্প কিছু খাবার আর নিয়মিত ওদের সাথে মেলামেশায় পাখিরা পাশে এসে বসছে, কোলাহলে মুখরিত করছে চারপাশটা। অথচ আমি পাখিটার জন্য সোনার খাঁচা বানাতে চেয়েছিলাম, পায়ে রুপার কাঠি ছুয়ে ঘুম পারাতে চেয়েছিলাম, তার গলায় তুলতে চেয়েছিলাম কৃত্তিম সুর। কিন্তু যে কৃত্তিম সুরের আশায় ব্যাকুল হয়ে ছিলো বিরহভুমি, সেখানে কয়েকটা রাত নিয়মিত মুষলধারার বৃষ্টি হয়েছিলো! 



একটা আদুরে আলপিন নিত্য খোঁচাচ্ছে, হাতে তার একটা কানা বগির ছা, সে ওটার নির্মলতাকে অনাবৃত করতে চায়, উন্মুক্ত করতে চায় সবকিছু। সেই আলতো খোচাখুঁচিতে কি যে নির্মম ব্যাথা লাগে, তারা জানে না, তারা বুঝতেও চায় না। আঠারো প্লাসকে তারা খুব সহজেই আঠারো মাইনাস করে ফেলে। একবার চিৎকার করে বলতে পারে না, আঠারো মাইনাসে তোমরা যৌনতাকে যেভাবে শেখাচ্ছ, সেটা আঠারো প্লাসে এসে বিকৃত রুপ ধারন করছে। কোয়াটারে মিলছে শিক্ষার্থীর লাশ, নীলকালো পলেথিনে বস্তাবন্দি হচ্ছে প্রকৃতি। প্রতিদিন নিউজফিড ভরে যায় এসব মানব বিকৃতির ইতিহাসে। আমি তো দেখছি, যে আঠারো মাইনাসকে আমরা পরিশুদ্ধ করার চেষ্ঠা করছি, আঠারো প্লাসদেরকে পরিশুদ্ধ করার প্রয়োজন তার থেকে ঢের বেশি, নয়তো কি লাভ আঠারো প্লাসের হ্যাসট্যাগের।


স্বরসতীর বাসরে নিধুরাম;


এদিকে নিথুরাম সন্ধা প্রদীপ জ্বালিয়েছে, কন্ঠে তার ভক্তির মালা, হটাৎ সেই সুরের মালা ছিন্ন হয়ে যায় একটা পুরনো খতিয়ানে চোখ পড়ে। ভীষণ রকম অভিমান নিথুরামের। তার পায়ের জুতোয় একটু ছোয়া লেগেছিল তার সন্ধার। তাই সেই ছেড়া জুতোটা এখনো পরে বেড়ায় সে, অথচ সন্ধার দেয়া সেই সুন্দর শার্টটা সে ফেলে রেখেছে আলনার কোণে। সন্ধার মানসপটে আঁকা যিশুর ছবি সম্বলিত ব্রেসলেটটা হারিয়ে ফেলেছে সেই কবে। নিথুরাম খুব বোকা তাইনা, সারাক্ষন সন্ধার  স্পর্শ খুঁজে ফেরে। কি ছিলো সেই স্পর্শে? রুদ্রদার কভু না পাওয়া খতিয়ানের কবিতা আজ গান হয়ে হৃদয় ভিজিয়ে দিচ্ছে অসংখ্য নিথুরামের।


"হাত বাড়ালেই মুঠো ভরে যায় ঋণে

অথচ আমার শস্যের মাঠ ভরা

রোদ্দুর খুঁজে পাইনা কখনো দিনে

আলোতে ভাসায় রাতের বসুন্ধরা


সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান;


রবিন্দ্রনাথ গীতবিতানে সুকুমার বৃত্তির চর্চায় ইন্ধন যোগাতে 

সহজ সরল যে কয়েকটি কথা বলেছেন তা সবসয়ের জন্য অনুকরণীয়:


সঙ্কোচের বিহব্বলতা নিজেরে অপমান,

সঙ্কটের কল্পনাতে হোয়ো না ম্রিয়মান।

মুক্ত করো ভয়,

আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।


দূর্বলেরে রক্ষা করো, দূর্জনেরে হানো,

নিজেরে দীন নিঃসহায় যেন কভু না জানো।

মুক্ত করো ভয়,

নিজের পরে করিতে ভর না রেখো সংশয়।


ধর্ম যবে শঙ্খরবে করিবে আহব্বান

নীরব হয়ে নম্র হয়ে, পন করিয়ো প্রাণ।

মুক্ত করো ভয়,

দুরূহ কাজে নিজেরই দিয়ো কঠিন পরিচয়।









Comments