ভুতেশ্বরের ভূত

 বোর্ডবাজারে মধ্যরাতে জোছনা আলোয় ফিরে এসেছে ভুবনেশ্বর, ভুবনেশ্বর সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়েছিল। ও একটা অচেনা, অশুভ শক্তিকে গলায় পেচিয়ে চিরবিদায় জানিয়েছিলো এই ধরনীকে, কিন্তু ধরনী তাকে বিদায় না জানিয়ে তাকে অভিশাপ দিয়েছিলো। বলেছিল, ভুবনেশ্বর, তুই ভূতেস্বর হয়ে বেঁচে থাকবি চিরকাল। সেই থেকে ভুবনেশ্বর আর পরলোকে যেতে পারেনাই পরে আছে এই জীর্ণ বোর্ড অফিসের অন্ধ ত্রিসিমানায়। আমাদের পরিষদের বুড়ো চৌকিদার মাখনলাল এই ভুবনেশ্বর কে মাঝে মাঝেই জোছনার আলো আধারে দেখতে পায়, তার সাথে কথা বলে। অনেকেই মাখনকে ভুবনের সাথে কথা বলতে দেখেছে, সবাই এ নিয়ে হাসাহাসি করেছে, মাখনকে টিটকিরি করেছে অথচ চেয়ারম্যান সাহেবের চোখের সামনে মাখন যখন ভুত ভুবনের সাথে কথা বলে কি যেন এক বিষাদ ভর করে চেয়ারম্যানের মুখে? কেনো? কি সম্পর্ক ভুবনের সাথে চেয়ারম্যান সাহেবের! 

মাখনের এই প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত টের পেত চেয়ারম্যান, প্রথম দিকে মাখনকে বোকাঝকা করলেও পরে যে কর্মফল ভুতের আশ্রয়ে চেয়ারম্যানের গলার কাটা হয়ে দাড়িয়েছিল সেই কাটা আর সরাতে পারেনি। এরপর থেকে মাখনের এধরনের অদ্ভুত আচরনে প্রতিবারই গলার কাটার ব্যাথা অনুভব করতো, মাখনলালকে থামানোর কোন শক্তিই আর চেয়ারম্যানের থাকতো না।

মানুষ যত মহাশক্তিরই অধিকারী হোক না কেন, খুব সুক্ষ্দর্শী একটা শক্তির কাছে তারা পরাজিত। এই ক্ষুদ্র সুক্ষ শক্তিকে তারা থামাতে পারে না, তাদের মহাশক্তিধর চেতনা যেন এই ক্ষুদ্র শক্তির কাছে পরাজিত।

এই তো সেদিন যখন ভুবনকে মাখনলাল প্রথম দেখেছিলো, সেকি ভয় পেয়েছিলো মাখন, আত্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল তার। বোর্ডের তিনকোণা বিল্ডিং এর একটা কোণায় বসে কাঁদছিল ভুবন। মাখন সাহস করে তার পাশে গিয়ে বসতেই ডুকরে কেঁদে উঠেছিলো ভুবন, বাঁধভাঙ্গা কান্না আর চাপা কষ্টে সেদিন জোছনার আলোয় পথের ধুলিকনায় ঝড়ে পরেছিলো তার আর্তনাদ। ভুবনদের জীবন প্রদীপ যেন জোছনা আর পথের বালুকণায় মিলেমিশে একাকার হতে দেখেছিলো মাখনলাল। মাখনের অনুভুতি যেন বলছিল ও ভাই, পথের ধুলোয় ভুবনদের কেড়ে নেওয়া জীবনাশক্তি আজও বিলিন হয়ে যায় নি, ধুলোবালির কণায় আজও ভেসে বেড়াচ্ছে ওদের আর্তনাদ।

এদিকে সুদ না খেয়েও সুদিরা যে না খেয়ে ঘুমিয়ে পরেছে, ওদের ঘরে চাল নেই, পাশের বাড়ির আলমগীর মিয়া ভুবনের অলংকার চুরি করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ, না খেয়ে ঘুমিয়ে পরা সুদির পেটে মোচড় দেয় জন্মান্ধ ক্ষুধা, দারস্থ হয় আলমগীর মিয়ার বাড়ির আঙ্গিনায়, কিন্তু আজ ক্ষুধার্ত সুদির জন্য আলমগির মিয়ার কোন মায়া নেই, তার চিন্তার ভিজিএফের উচ্ছিষ্ঠাংশ তাকে নিয়ে চলে মরুর কাফেলায়, সেই কাফেলার স্বপ্নে আলমগির মিয়া বিভোর। ভুলে যায় সুদির পেটে মোচড় দিয়ে ওঠা জন্মান্ধ ক্ষুধা নিবারণের চাবিটা তারই হাতে। আলমগীর মিয়ার নির্দয় কন্ঠে বেজে ওঠে নিয়মকানুনের বিষবাস্প।

মাখন জানে, আজ আবার পূর্ণিমার তিথিতে এলোমেলো এই জনযাত্রার শেষে, নিশুশি এই রাতে আবারও ভুবন ফিরে আসবে, মাখনে আর ভুবনে মেতে উঠবে গালগল্পে, মাখনের না বলা অসংখ্য অনুভুতি,  ভুবনের চেতনায় তার মানসী, তার সহজ সরল পথচলাটা কিভাবে যেন কিছু মহান মানুষের দাম্ভিকতায় বাধার সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু যে ভুবনকে মাটি ধারন করেছে তাকে নিঃশেষ করবে কে? কার এত শক্তি, কার এতো সাহস? ওরে ভুবনেরা নিঃশেষ হয়ে যায় না, ধরনীর দেয়া অভিশাপ তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে অনন্তকাল।

এই ছোট্ট বোর্ড অফিসে প্রতিনিয়ত রচিত হয় কত ঘটনা, কত ভালোমন্দের মায়াজাল, কত ক্ষুধার্তের অপেক্ষার সময়, কত মানুষের হাসিকান্নার চেতনা, কত কিছুই না রচিত হচ্ছে প্রতিদিন। কত মাখনের বুকে জমে থাকা পৃথিবীর ভয়, কত ভুবনের চাপা কান্না, কত সততার জলাঞ্জলি। চেয়ারে বসে থাকা মানুষটা পাল্টে যায় আসে নতুন কেউ, সবাই বদলায়, মানুষের মনও বদলে যায়, কিন্তু এই জীর্ণ পরিষদটা, আর নিত্যানন্দ মাখনলাল বদলাতে পারে না। ভুতেস্বরের হাজারো কথারা মাখনলালদের বদলাতে দেয় না

আজ এই ভরা জোছনায় কি হল মাখনলালের? তার চিৎকার পৌছে যাচ্ছে এই বোর্ড অফিসের প্রতিটি ইটের মধ্যে? তার চিৎকারের তরঙ্গে কাপছে বাতাস, নড়ে উঠছে বৃক্ষের পাতা, কেউ কোথাও নেই অথচ মাখনলাল চিৎকার করেই যাচ্ছে! পাখিরা সব যে যার নীড়ে ফিরে গেছে, ক্লান্ত শ্রান্ত দেহে ঘুমিয়ে পরেছে ওরা আর বোকা মাখনলাল!  কে শুনছে তার এই আর্তচিৎকার।





Comments