মায়া
একটি কমপ্লেক্স ইমোশন
মানুষ হিসেবে আবেগ আমাদের অন্যতম অভিজ্ঞতা। আমরা আনন্দবোধ করি, ব্যাথা পাই, দুঃখ পাই, ভালোবাসি আরো অনেক কিছু। এটা মানুষের স্বভাবজাত প্রবৃত্তি। মানুষ তার পুরো জীবনে নানান ধরনের আবেগের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। এর মধ্যে অনেক ধরনের আবেগ সহজ সরল আবার অনেক ধরনের আবেগ খুব কমপ্লেক্স।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, কমপ্লেক্স ইমোশন হল এমন এক ধরনের ইমোশন, যা একজন মানুষের আত্বদর্শন ও আত্বউন্মোচন ভিত্তিক একধরনের জ্ঞানমুলক প্রক্রিয়া।
যেমন- লজ্বিত হওয়া, গিলটি বোধ করা, গর্ববোধ করা অথবা এ্যামব্যারেসিং সিচুয়েশনে পরে যাওয়া এধরনের আরো অনেক কিছু। সহজভাবে এধরনের ইমোশন, রাগ, ভয় ও আনন্দের মত সিম্পিল ইমোশনের থেকেও অনেক বেশি গভীর।
মুলকথা, কমপ্লেক্স ইমোশন হল, একজন মানুষের প্রকৃতি ও জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কার্যকারনের সচেতনতা। এ ধরনের ইমোশনে মানুষ বিক্ষিপ্তভাবে নিজে কে জাজম্যান্ট করে। লজ্বিত হওয়া কমপ্লেক্স ইমোশনের সবচেয়ে ভালো উদাহারন। সাধারনভাবেই মানুষ লজ্জিত বোধ করে কারন মানুষের কোন ভুল করে যখনই অন্য কারো উপর তার নেগেটিভ ইম্প্যাক্ট পরতে দেখে। আমাদের ব্রেইন তখনই সেই ভুলটাকে বুঝতে শুরু করে, নিজেদের প্রতিটা এ্যাকশন, সেই একশনের সংশ্লিষ্ট অনান্য সকলকিছু। ঠিক এ জায়গা থেকেই লজ্বিত হওয়ার একটা কমপ্লেক্স ইমোশন যাত্রা শুরু করে, তারপর সেটা বদলে যায় গিলটি ফিলিংসে, সেই গিলটি ফিলিংস অনেকধরনের এ্যামব্যারেসিং সিচুয়েশন তৈরী করে।
কমপ্লেক্স ইমোশনের একটা স্টেজে মানুষ পরিচিত হয় বিশ্বাস নামের অদ্ভুৎ কোনকিছুর সাথে। বিশ্বাসের প্রাথমিক পর্যায় অনুধাবন করা। একজন মানুষ যখন আরেকজনকে যত গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারে তখন সেই ব্যাক্তির প্রতি তার বিশ্বাস তত গভির হয়, আর অনুধাবন যত দুর্বল বিশ্বাসও তত দুর্বল হয়ে পরে।
যাকগে, সনেট কে কমপ্লেক্স ইমোশন নিয়ে চিন্তা করার মেশিন বলা হয়। অনেকে সনেট বুঝতে পারে না। সনেট হচ্ছে ইলুশনের একধরনের ইমোশনাল ড্রামা, একধরনের প্রতারনা, কোন ক্রাইসিস আর রিসলিউশন যা একজন ব্যাক্তি সুচিন্তিত উপায়ে পাঠকদের চিন্তা করতে ও অনুভব করার জন্য সাজিয়ে রাখে।
এ্যামব্যারেসমেন্ট বা বিব্রত অবস্থা হচ্ছে একধরনের স্ব-স্বচেতন ইমোশন যা রাগ, বিষ্ময় ও ভয়লাগার মতো অটোমেটিক সহজ ইমোশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় যেগুলো কোন ধরনের কগনেটিভ প্রসেসিং ছাড়াই এ্যামব্যারেসমেন্টের মত গভীর ও কমপ্লেক্স ইমোশন তৈরী করে নেয়। যেমন কোন ছেলেকে তার সমবয়সি কোন মেয়ে আংকেল ডাকলে ছেলেটা যে বিব্রত হয় সেটা সে ভুলে গেলেও তার অবচেতন মন ঠিকই মনে রাখে, ঠিক একই ঘটনা যখন আবার ঘটে, ছেলেটার রাগ প্রকাশ পায়, অথবা নিজের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরী করে।
সহজভাবে মানুষ তার আচার আচরনে তৈরী হওয়া একটা সেট আকরে ধরে বেড়ায়। বিহাইন্ড দ্যা সিনে খুঁজলে হয়তো সাইকোলজির একটা নিদিষ্ট প্যাটার্ন পাওয়া যায়। আবেগে পরে যখন আমাদের মধ্যে রাগ আর ভয় কাজ করে তখন আমাদের হার্ট রেট বেড়ে যায় আবার পরক্ষনেই আমরা যখন এ্যামব্যারেসিং সিচুয়েশনটা অনুভব করা শুরু করি হার্ট রেট স্বাভাবিক হওয়া শুরু করে ফলে আমাদের মধ্যে লজ্বিত ভাব চলে আসে। অনেকে লজ্বিত হওয়া আর বিব্রত হওয়ার মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না, মনে করে দুইটাই একই। কিন্তু দুটোই এক ব্যাপার না। এক বড় ভাই যখন আদর করে তার ছোটবোনকে কটকটি, চেপ্টি অথবা পকন ডাকে, তার ছোটবোন যেন লজ্বাবনত মুখে তার দিকে তাকায়, কিন্তু জনসম্মূখে যখন ঐ নাম ধরে ডাকে, তখন কিভাবে যেন ছোটবোনের মুখে বিব্রত ভাব চলে আসে।
ছোটবোন থেকে মনে হল, আচ্ছা আমরা ছোটদের মধ্যে কোনকিছু নিয়ে ইমোশন তৈরী করি, খুব যত্নে সেই ইমোশনকে লালন পালন করি অথচ যখন ছোটরা বায়না ধরে বসে তখন আমরা তাদের শেখাই, এটার থেকে ওটা আরো ভালো, আজ নয় কাল, ওটার দাম বেশি, এটা নে, এটার দাম কম, এটা আরো সুন্দর। ছোটরা তখন কান্নাকাটি শুরু করে দেয়, না, আমার ঐটাই লাগবে! তখন শুরু হয় বড়দের মানসিক টর্চার। ওহহো তোকে নিয়ে আর পারি না টাইপ। এই এ্যামব্যারেসিং ঘটনার মুখোমুখি হয়ে ছোটদের যেটা দেয়া হয়, সেটা পেয়েই তারা নিজেদের খুশি করার চেষ্ঠা করে সময় যতই যেতে থাকে তারা বুঝতে পারে, আরে এটার মধ্যে তো ঐ ইমোশনটা নাই, এটাতো আমি চাইনি দ্যান, শুরু হয় জীবনের ঝোলঝাল।
এ প্রসঙ্গে আমেরিকান সাইকোলজি এসোসিয়েশনের ক্রিস্টেন ওয়াইর নামে একজন তার আর্টিকেলে খুব সুন্দর দুইটা লাইন লিখছে,
"এ্যামব্যারেসিং মোমেন্টকে সহজভাবে নিতে শিখলে মানুষ হাসতে শেখে, আর লজ্বিত অবস্থাটাকে কঠিনভাবে নিলে মানুষের সেন্স অব হিউমার হারিয়ে যায়"
যাইহোক, কমপ্লেক্স ইমোশন যেমন রাগ, ঘৃণা, গিলটি, গর্ব এসব কিছু আসলে খারাপ কিছু নয়। এইসব আমাদের মধ্যে আত্বদৃষ্টি, আত্বউদ্দীপনা ও নিজেদের মধ্যে এসোসিয়েটিভ অনেককিছু তৈরী করে চলে।
কী-ওর্য়াড:
কমপ্লেক্স ইমোশন, স্ব-স্বচেতন, আত্বদর্শন, আত্বউন্মোচন,লজ্বিত হওয়া, গিলটি বোধ করা, গর্ববোধ করা, এ্যামব্যারেসিং সিচুয়েশন, সনেট, কগনেটিভ প্রসেসিং, আত্বদৃষ্টি, আত্বউদ্দীপনা, নিজের মধ্যে এসোসিয়েটিভ অনুভূতি।
উপজীব্য:
কমপ্লেক্স ইমোশনে পরে এ্যামব্যারেসিং সিচুয়েশনটাকে সহজভাবে বোঝা। স্ব-স্বচেতনতার মাধ্যমে আবেগকে এক ধরনের কগনেটিভ প্রসেসিং করা । ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিহাইন্ড দ্যা সিনে কিক লুকিয়ে আছে সেটা জানা । কমপ্লেক্স ইমোশনে উঠে আসা আত্বদৃষ্টি, আত্বউদ্দীপনা ও নিজেদের মধ্যে এসোসিয়েটিভ দৃষ্টিভঙ্গি জাগানো ।

Comments
Post a Comment